কালিম প্রজাপতি (Common Mormon): একটি বৈশিষ্ট্যভিত্তিক পরিচিতি!

Author: Sidratul Muntaaha Twaha

©Twaha

সমগ্র এশিয়া জুড়ে খুব কমন যে প্রজাপতি, যাকে প্রতিটা দিনই ঘর ছেড়ে বেরুলে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, সে হলো কালিম বা ইংরেজিতে Common mormon। কালো রঙা এই কালিমের পরিচিতি জেনে আসা যাক।
কালিমের বৈজ্ঞানিক নাম Papilio polytes (Linnaeus 1758) যা Papilionidae ফ্যামিলির অন্তর্ভুক্ত একটি সোয়ালোটেইল (swallowtail) প্রজাপতি। Swallowtail বলার কারণ হচ্ছে এদের পশ্চাৎ ডানা স্ফীত হয়ে লেজের মতো গঠন করে।
অন্যান্য প্রাণীর মতো প্রজাপতির মধ্যেও যৌন দ্বিরূপতা দেখা যায়। সহজ কথায় প্রজাপতির পুরুষ এবং স্ত্রী আলাদা।আবার প্রজাপতির ক্ষেত্রে বহুরূপীতা বা পলিমরফিজম ও দেখা যায়। পলিমরফিজম মানে হলো একই প্রজাতির প্রাণীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ। কালিমের ক্ষেত্রে স্ত্রী প্রজাপতির সাধারণত তিন ধরনের রূপ আছে। সাইরাস, স্টিচিয়াস এবং রোমুলাস।
পুরুষ দের মধ্যে শুধু মাত্র একটি রূপই দেখা যায়। এখন এই জটিল নামের প্রজাপতি গুলো দেখতে কেমন?
কালিমের ক্ষেত্রে পুরুষ এবং স্ত্রী বের করা খুবই সোজা।
কালিমের স্ত্রী প্রজাতিটাই পুরুষের তুলনায় বেশি সুন্দর। কালিমের পুরুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এদের ডানায় সাদা কালো ছাড়া আর কোনো রঙ থাকেনা। পুরো দেহ ঘন কালো থাকে,নিচের পাখায় ছোপ ছোপ সাদা দাগ থাকে, তবে সামান্য লাল রঙের ছোঁপও দেখা যেতে পারে। স্ত্রীদের মাঝে যে রূপটি দেখতে অনেকটা পুরুষের মতো তাদের বলা হয় সাইরাস।
স্টিচিয়াস এবং রোমুলাস দেখতে পুরোপুরিভাবে ভিন্ন। এরা পুরুষদের মতো তো নয়ই, বরং এরা Papilionodae ফ্যামিলির বিভিন্ন বিষাক্ত প্রজাপতির মতো রঙিন। এদের পাখায় লক্ষনীয় লাল বা কমলা রঙ দেখা যায়। তাদের উপরের পাখায় কালোর সাথে অল্প সাদা আবহ থাকে, আর নিচের পাখায় সুন্দর করে লাল কমলা ছোপ দেখা যায়।
পুরুষের মধ্যে স্টিচিয়াস এবং রোমুলাস এই দুই রূপ নেই, তাই সহজেই কালিমের স্ত্রী পুরুষ আলাদা করা যায়।

কালিমের রূপান্তর ও অন্যান্য প্রজাপতির মত। সে প্রথমে ডিম পাড়ে, সেই ডিম থেকে খয়েরি সাদা রংয়ের বিকট দর্শন কিন্তু খুব ছোট্ট একটা লার্ভা বের হয়। দেখতে অনেকটা পাখির বিষ্টার মত।
কালিমের ডিম ফুটতে সময় লাগে ৩ থেকে ৬ দিন। ডিম ফোটার পর, খুব ছোট,প্রায় ১ সেন্টিমিটার সমান একটি লার্ভা বেড়িয়ে আসে, এই লার্ভা, ডিমের খোলস টাও খেয়ে ফেলে। তারপর সে ধীরে ধীরে পাতা খেতে খেতে বড় হয়। লার্ভার প্রথম ইনস্টার বা খোলস মোচন হয় ৭/৮ দিনের মধ্যে। এ সময় লার্ভা ১ থেকে দেড় ইঞ্চের মতো লম্বা হয়, এবং তার বিদঘুটে রূপ থেকে একটু সুশ্রী রূপে আসে। কালিমের প্রথম লার্ভা দশা হলো সবুজ বা খয়েরি রঙা, সবুজের সাথে সাদা চুনের মতো দেখতে কিছু রঙ লেপটে দেওয়া।

এই লার্ভা বা শুঁয়োপোকা গুলো মূলত পাতা খাওয়ার মেশিন হয়, কারণ এরা প্রচুর পাতা খায়। পিচ্চি একটা পোকা সারাদিন তাদের শক্তিশালী চোয়াল দিয়ে কুচকুচ করে বড় সাইজের একটা লেবু পাতা খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে।
আবার সে যেকোনো গাছের পাতা খায় না, যে গাছে প্রজাপতি ডিম পাড়ে, সেই গাছের পাতা খেয়েই প্রজাপতির লার্ভা রা বড় হয়। এবং আমাদের কালিমের লার্ভা গুলো লেবু গাছের পাতা খায়।
৫ বার খোলস মোচনের পর লার্ভা টা পিউপা দশায় চলে। একেকবার খোলস মোচনে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগে, এবং পিউপা দশায় যেতে আরো বেশি সময় লাগে।
হুট করেই একদিন দেখবেন আপনার সুন্দর হেসে খেলে বড় হওয়া শুয়োপোকা টা হঠাৎ গুটিয়ে যাবে। গুটিয়ে যেতে যেতে তার বড় বড় পা গুলো ছোট হতে থাকবে, এবং ইয়া বড় লার্ভা টা ধীরে ধীরে একটা ছোট্ট প্যাকেটে পরিণত হবে।
টুইস্ট হচ্ছে এই প্যাকেট টা দেখতে একদম জড়বস্তুর মত হলেও এটা কিন্তু জীবিত। প্যাকেট টা যদি একটু আঙ্গুল দিয়ে নাড়িয়ে দেখা হয় , তখন দেখা যাবে প্যাকেট টা নড়ে উঠছে। এবং ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে প্যাকেটটা একবার না, নিজে নিজেও অনেকবার নড়ে। এই নড়াচড়া হলো পিউপা টা বেচে আছে নাকি মরে গেছে তা বুঝার মোক্ষম উপায়।
এই পিউপা গুলো কেবল প্যাকেট হলেও, এদের ডিফেন্স সিস্টেমে দারুণ। লার্ভার যেমন পাখি, পোকা মাকড়ের আক্রমণের ভয় থাকে, তেমনি পিউপার উপর ও বিভিন্ন পোকামাকড় আক্রমণ করে। এ কারণে পিউপা গুলো আবারো ক্যামোফ্লেজ টেকনিক ইউজ করে। ছদ্মবেশ ধারণ করে, যে গাছে সে বড় হচ্ছে তার রঙ ধারণ করে, বা যে পাতায় বড় হয় সে পাতার সবুজ রঙ ধারণ করে।
একটা পিউপা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই রঙ থাকে, যেদিন প্রজাপতির বেরুবার সময় হবে সেদিন বাইরে থেকে প্রজাপতির নানা রঙ দেখা যায়। পিউপার ভিতর পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি গঠন হতে ৯/১০ দিন সময় লাগে। বিভিন্ন প্রজাপতির ক্ষেত্রে পিউপাল দশার সময়ে ভিন্নতা দেখা যায়। কালিমের ক্ষেত্রে ৯/১০ দিন ।
পিউপার ভিতর থেকে সরাসরি একটা ইমাগো বা পূর্ণাঙ্গ প্রানী বের হয়। মানে সরাসরি প্রজাপতি বের হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এত ছোট খোলসে এত বড় প্রজাপতি কেমনে থাকবে? প্রজাপতি থাকে তার পাখা গুটিয়ে। সে খোলস থেকে বের হয়ে তার পাখায় অবস্থিত শিরার মধ্যে রক্ত পাম্প করে ধীরে ধীরে তার সুন্দর পাখা গুলো খুলে, অনেকটা ফু দিয়ে বেলুন ফোলানোর মতো। ৮ থেকে ১০ মিনিট সময় নেয় পাখা খুলতে
এরপরই সে উড়তে শুরু করে। এবং ফুলে ফুলে উড়ে মধু খাওয়া শুরু করে।

কালিমের পুরুষ প্রজাপতি রা স্ত্রী দের তুলনায় দ্রুত বেগে উড়ে। পাহাড়ি অঞ্চল, লেবু জাতীয় গাছের বাগান, কম বৃক্ষাচ্ছাদিত অঞ্চলে কালিমের বিস্তার দেখা যায়। বর্ষার পর লেবু জাতীয় গাছে খোঁজ করলেই প্রচুর শুঁয়োপোকা পাওয়া যাবে। শুঁয়োপোকা লালন পালন খুব ইন্টারেস্টিং একটা শখ! প্রজাপতির অসাধারণ মেটামরফোসিস দেখার মত একটা বিষয়। কাজ কম, আনন্দ বেশি। অল্প কাজেই স্রষ্টার এই সুন্দর সৃষ্টির অসাধারণ মেটামরফোসিস জীবনে একবার হলেও দেখা উচিত।

Leave a comment

Design a site like this with WordPress.com
Get started